চোরেদের হাত থেকে মাঠের ফসল রক্ষা করতে অনেক গ্রামেই মাঠ পাহারার ব্যবস্থা করতে হয়। এক সময় ভিন মেলা, বিশেষ করে মুর্শিদাবাদ জেলা থেকে আর্থিকভাবে দুর্বল মানুষজন বীরভূমে আসতেন মাঠ পাহারার কাজে। সেই সময় উচ্চ ফলনশীল ধানের চাষ না হওয়ার কারণে এবং আকাশের বৃষ্টির উপরে নির্ভরশীল চাষাবাদ হওয়ায় বছরে একবারমাত্রই ধান চাষ হত, যা সম্পূর্ণভাবেই ছিল বৃষ্টিনির্ভর। আর কিচু কিছু এলাকায় ছিল ক্যানেলের জলে বিকল্প সেচব্যবস্থায় চাষাবাদ। আর তাই কৃষিজমি সেচ ও আসেচ এলাকায় জমি হিসেবে চিহ্নিত হত। ঘটেছে। মাঠে মাঠে বিদ্যুৎ সরবরাহের মধ্য দিয়ে মাধ্যমে বিকল্প সেচব্যবস্থার মধ্য দিয়ে। তাই বর্তমান সময়ে আসেচ জমির পরিমাণও কমে যাচ্ছে দ্রুততার সঙ্গে। বছরে একবারের পরিবর্তে দুবার ধানচাষ, প্রায় সর্বত্রই হচ্ছে। বিকল্প সেচব্যবস্থায় হচ্ছে অন্যান্য চাষাবােদও।
অতীতে যখন একবার ধান চাষ হত, তখন বীরভূমের পার্শ্ববর্তী মুর্শিদাবাদ জেলা থেকে আসতেন মাঠ পাহারার কাজে। বিঘাপ্রতি তাদের আটিধান হিসেবে চার গণ্ড অর্থাৎ ষোলো আটি ধান দেওয়া হত। তারা সেই ধান একত্রিত করে রাখতেন। মাঠের সব ধান জমির মালিকদের ঘরে পৌছে গেল, মাঠ পাহারাদাররা তাদের পাওনা আঁটি ধান বাড়িয়ে তা নিয়ে নিজ নিজ গ্রামে ফিরতেন। মাটির দেওয়ালের খড়ের চাল ছাওয়ার জন্য তাদের অনেকেই খড়ও নিয়ে যেতেন। কিন্তু বর্তমান সময়ে বিকল্প সেচব্যবস্থায় একাধিকবার ধান চাষ হওয়ায় এবং বিভিন্ন ক্ষেত্রে গ্রামে আর্থ-সামাজিক কাঠামোর বদল ঘটায় ভিন জেলা থেকে মাঠ পাহারায় আগের প্রথাটাই প্রায় বিলোপ ঘটে গিয়েছে। আবার বহু গ্রামে দেখা গিয়েছে, গ্রামেরই মানুষজন মাঠ পাহারা দিয়ে, তার বিনিময়ে পাওয়া ধান বিক্রি করে গ্রামের বহু জনহিতকর কাজ করেছেন। অনেক গ্রামে মাঠ পাহারার ধান বিক্রি করে যাত্রাপালার আয়োজন করেছে। গ্রামেরই ছেলেরা। বহুক্ষেত্রে এই প্রথার আজও
বিলোপ ঘটেনি। বহু গ্রামে বিনােদনমূলক এইসব আসর বসেছে গ্রামের কোনও ক্লাব বা মন্দির চত্বরে। আর মাঠ থেকে ধান বা লক্ষ্মীকে নিরাপদে বাড়িতে নিয়ে আসায় বহু গ্রামে লক্ষ্মীপুজোরও প্রবর্তন হয়েছে। কিন্তু কালীপুজোর প্রবর্তন তেমন একটা হয়নি। বীরভূমে ঠিক এরকমভাবেই লক্ষ্মীপুজোর পরিবর্তে কিন্তু এই মাঠ পাহারাকে কেন্দ্র করে যে পুজোর প্রবর্তন হয়েছে, তা কিন্তু লক্ষ্মীপুজো নয়, কালীপুজো। সাঁইথিয়া-বহরমপুর রাস্তায় ময়ূরেশ্বর থানার ফলেশ্বরে একটি চেকপোস্ট রয়েছে সরকারিভাবে। এটি স্থানীয়ভাবে বর্ডার হিসেবে খ্যাত। এই এলাকায় কয়েকশো ঘর লোকের বসবাস। এই জনবসতি চেকপোস্ট গ্রাম করলেও, মুসলমান সম্প্রদায়ের মানুষের সংখ্যাই বেশি। গ্রামে উভয় সম্প্রদায়ের মধ্যে রয়েছে প্রীতির সম্পর্ক। এই গ্রামের মানুষ লক্ষ করছিলেন, এলাকায় হামেশাই চুরি, ছিনতাই যেমন ঘটছে, তেমনই চুরি হয়ে যাচ্ছে মাঠের
ফসল। তাই গ্রামবাসীরা একত্রিত হয়ে ঠিক করলেন, তারা মাঠের ফসল পাহারা দেওয়া ছাড়াও রাস্তা এবং গ্রাম পাহারাও দেবেন। দুষ্কৃতীদের ঠেকাতে। আর এজন্য মাঠ পাহারা থেকে যে আয় হবে, তা থেকে তারা গ্রামে কালীপুজো করার সিদ্ধান্ত নেন। মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষের আগ্রহে। গ্রামে প্রবর্তন হয়। কালীপুজোর, যা এবার ২৩ বছরে পড়ল। গ্রামের মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষজন জানান, গ্রাম এবং মাঠের ফসল রক্ষা করার জন্য যদি উভয় সম্প্রদায়ের মানুষ একত্রিত হতে পারি, তাহলে পুজোতেই বা পারব না কেন? আর এই গ্রামের কালীপুজো বর্তমানে বর্ডার কালীপুজো নামেই পরিচিত হয়েছে। এই পুজো তাতে গ্রামের উভয় সম্প্রদায়ের মানুষই রয়েছেন। এই বর্ডার কালীপুজোতেও যে প্রসাদ বিতরণ করা হয়, তা যেমন উভয় সম্প্রদায়ের মানুষ গ্রহণ করেন, তেমনই পাত পেড়ে খাওয়াদাওয়ার যে ব্যবস্থা হয়, তাতে হিন্দুপাতে পাত ঠেকিয়ে পাশাপাশি।

No comments:
Post a Comment
thanks for the comment